হরপ্পা সভ্যতার পতনের কারণ কী ছিল?

দীর্ঘদিনের উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত অস্তিত্বের পর ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ হরপ্পা সভ্যতার দুটি প্রধান কেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারাের বিলপ্তি ঘটে এবং পরবর্তী একশাে বা দেড়শাে বছরের মধ্যে সমগ্র হরপ্পা সভ্যতা অবলুপ্ত হয়। এই অবলুপ্তির কারণ সূচনা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা একমত নন। সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলি পরীক্ষা করে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী তারা বিভিন্ন কারণের উল্লেখ করেছেন।

এইসব কারণের পিছনে কিছু যুক্তি থাকলেও কোনওটিকেই অনিবার্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। আসলে সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। হরপ্পা সভ্যতার বিলুপ্তির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের কয়েকটি মৌলিক বিষয় মনে রাখতে হবে।

(১) সিন্ধু উপত্যকা এবং তার বাইরে যে বিশাল এলাকা জুড়ে এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল, তা কিন্তু সমস্ত এলাকায় একই সাথে বিলুপ্ত হয় নি। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারাের বিলুপ্তির একশো বা দেড়শাে বছর পরেও সুরকোটরা প্রভৃতি অঞ্চলে এই সভ্যতা টিকে ছিল। এরও পরে গুজরাট, রাজস্থান ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কোনও কোনও অঞ্চলে ভঙ্গুর অবস্থাতেও এই সভ্যতা তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

(২) হরপ্পা সভ্যতার সকল কেন্দ্রগুলির পতনের পশ্চাতে একই কারণ বা প্রেক্ষাপট ছিল না। দু-একটি নগর বা কেন্দ্রের পতনের কারণ এক হলেও সর্বত্র তা সমান ছিল না।

(৩) আকস্মিকভাবে হঠাৎ একদিনে সিন্ধু সভ্যতার পতন হয় নি। দীর্ঘদিন ধরে ক্রমিক অবক্ষয়ের ফলে সভ্যতাটি অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে এবং তার পরেই আসে চরম বিপর্যয়, যা সভ্যতাটির বিলুপ্তি ঘটায়।

(১) অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়: হরপ্পা সভ্যতার পতনের জন্য অনেকে বিদেশি আক্রমণকে দায়ী করে থাকেন, কিন্তু কেবলমাত্র বিদেশি আক্রমণ একটি সমুন্নত সভ্যতার ধ্বংসসাধন করতে পারে না। অভ্যন্তরীণ অবক্ষয় পতনের পথকে প্রশস্ততর করলেই বিদেশি আক্রমণ তা ত্বরান্বিত বা সম্পূর্ণ করে। হরপ্পা সভ্যতার অবক্ষয় দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। সভ্যতার নীচের স্তরগুলিতে নাগরিক সভ্যতা ও জীবনযাত্রার পদ্ধতি ছিল অনেক উন্নত, কিন্তু উপরের স্তরগুলিতে শােচনীয় অবক্ষয়ের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। বাড়িঘরগুলি রাস্তার উপর উঠে আসছে, গলিগুলি সকীর্ণতর হচ্ছে, গলিতে ইটের পাঁজা তৈরি হচ্ছে, নর্দমাগুলি পরিষ্কার হচ্ছে না এবং তা ধীরে ধীরে বুজে আসছে। বড়াে বড়াে অট্টালিকার স্থলে তৈরি হচ্ছে ছােটো ছােটো বাড়ি এবং তাও আবার পুরােনাে ইট দিয়ে। বড়াে বড়াে ঘরগুলি ক্রমশ ছােটো ছােটো কক্ষে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজের অবনতি ঘটছে এবং মৃৎপাত্র তার পূর্বগৌরব বজায় রাখতে অক্ষম হচ্ছে। এই কারণে স্যার মর্টিমার হুইলার মন্তব্য করেছেন যে, পরবর্তীকালের মহেঞ্জোদারাে ও হরপ্পা ছিল তাদের প্রাথমিক পর্বের ছায়ামাত্র। বিদেশি আক্রমণের অনেক আগেই অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের ফলে হরপ্পা সভ্যতার প্রাণবায়ু নিঃশেষিত হয় এবং বিদেশি আক্রমণের ফলে তার পতন ঘটে। অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের জন্য বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করা হয়।

(ক) রক্ষণশীল মানসিকতা: হরপ্পাবাসীর রক্ষণশীল মানসিকতা বা মানসিক বন্ধ্যাত্ব হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। সভ্যতার উচ্চ শিখরে আরােহণ করা সত্ত্বেও তারা যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে নি। তারা নতুন কিছু শিখতে চাইত না। নতুনকে উপেক্ষা করে তারা পুরােনােকেই আঁকড়ে ধরে থাকে। এর ফলে তাদের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সমসাময়িক মিশরীয় ও সুমেরীয় সভ্যতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তারা সেখান থেকে কিছু শেখে নি। মেসােপটেমিয়াবাসী খাল কেটে জলসেচের মাধ্যমে ব্যাপক হারে ফসল উৎপন্ন করত। অন্যদিকে হরপ্পাবাসী জলাধার তৈরি করে সেখানে বন্যার জল ধরে রেখে তা চাষের কাজে ব্যবহার করত — তারা খাল খননের কথা চিন্তা করে নি। হরপ্পাবাসী উর্বর গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষি সম্প্রসারণ, ভারী লাঙলের ব্যবহার, লােহার যন্ত্রপাতি নির্মাণ বা কৃষিব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করার কোনও চিন্তা করে নি। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার জন্য ভারী অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণের কথাও তারা ভাবতে পারে নি। এছাড়া, মেসােপটেমিয়ার সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক যােগাযােগও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। নতুন কিছু শেখার মানসিকতা না থাকায় পরিণতি অবশ্যই মারাত্মক হয়ে ওঠে।

(খ) প্রাকৃতিক কারণ: হরপ্পা সভ্যতার পতনের জন্য অনেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করে থাকেন।

(i) এ ব্যাপারে ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা হয়। স্যার মর্টিমার হুইলার বলেন যে, প্রথমদিকে সিন্ধু উপত্যকায় প্রবল বৃষ্টিপাত হত এবং এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এখানকার সিলে গন্ডার, হাতি, বাঘ, বাইসন, মোষ প্রভৃতি জীবজন্তুর ছবি উৎকীর্ণ আছে। এ থেকে বােঝা যায় যে, এই অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বাস করত। সাধারণত বৃষ্টিবহুল স্যাৎসেতে অঞ্চলে এইসব জীবজন্তু বসবাস করে। কালক্রমে নগর সভ্যতার সম্প্রসারণ এবং গৃহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে পােড়া ইট তৈরির জন্য ব্যাপক বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে সমগ্র অঞ্চলটি বনশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। এর ফলশ্রুতি হিসেবে কৃষিকার্যের অবনতি ঘটে, নিকটবর্তী স্থানে মরুভূমি থাকায় এই অঞ্চলের শুষ্কতা বৃদ্ধি পায়, ভূগর্ভস্থ লবণ ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে এবং কালক্রমে স্থানটি গরম মরুভূমিতে পরিণত হয়। এছাড়া রাজপুতানার মরু অঞ্চলের ক্রমপ্রসারকেও এই সভ্যতার পতনের জন্য দায়ী করা হয়। সিন্ধু সভ্যতার বিনাশ প্রসঙ্গে স্যার অরেল স্টাইন এর বক্তব্যও প্রণিধানযােগ্য। তিনি ভারত সীমান্তে গেড্রোসিয়া বা বেলুচিস্তানের জনহীন উষরভূমির উপর সমৃদ্ধশালী বসতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তার মতে বেলুচিস্তানে এই শুষ্কতার সূচনা হয় তাম্র প্রস্তর যুগ (Chaleolithic age) থেকে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিকবীর আলেকজাণ্ডারের আক্রমণকালে এই শুষ্কতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং তার সেনাদলের পক্ষে এই শুষ্ক মরু অঞ্চল অতিক্রম করা সহজ হয় নি। হরপ্পা সভ্যতা বিনাশের পক্ষে এই ক্রমবর্ধমান শুষ্কতা বহুলাংশে দায়ী ছিল। রাইকস, ডাইস ও ফেয়ারসার্ভিস আবহতত্ত্ব, উদ্ভিদতত্ত্ব ও প্রাণীতত্ত্বের হিসেব নিকেষ করে জানান যে, সিন্ধু অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ ধরনের কোনও বড়াে পরিবর্তন ঘটে নি।

(ii) অনেকের মতে, সিন্ধু ও তার শাখানদীগুলি এবং অন্যান্য নদ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই সভ্যতার পতন ঘটে। সিন্ধুনদ তার গতিপথ পরিবর্তন করলে বন্দর মহেঞ্জোদারাে তার গুরুত্ব হারায়। জলাভাব ও শুষ্কতা বৃদ্ধির ফলে মহেঞ্জোদারাে ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। খাল খনন করে হয়তাে এ সমস্যার সমাধান করা যেত, কিন্তু মহেঞ্জোদারােবাসী সে পথে অগ্রসর হয় নি — তারা সম্ভবত নগরটি ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কেবলমাত্র সিন্ধুনদই নয় — শতদ্রু ও যমুনা নদীরও গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ঘগগর, দৃষদ্বতী ও সরস্বতী নদীও জলের অভাবে শুকিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উপর যে এর ফল কত মারাত্মক হয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

(iii) অনেকের মতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে হরপ্পার নগরগুলি ধ্বংস হয়েছিল এবং সিন্ধু উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চলই ছিল ভূমিকম্পের উৎসস্থল। তাদের যুক্তির সমর্থনে তারা মহেঞ্জোদারােতে প্রাপ্ত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলির কথা বলে থাকেন। কঙ্কালগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন। সম্ভবত ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার জন্যই মৃতদেহগুলির গায়ে ক্ষতচিহ্ন ছিল এবং মৃতদেহগুলির সৎকার করাও সম্ভব হয় নি। এই মতবাদ সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়, কারণ মহেঞ্জোদারাের ক্ষেত্রে এই মতবাদ প্রযােজ্য হলেও হরপ্পা সভ্যতার অন্যান্য নগরগুলির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প তত্ত্ব খাটে না। Dr. H.D. Sankalia প্রশ্ন তুলেছেন যে, মহেঞ্জোদারাে নগরটি ধ্বংস হলে তার অধিবাসীরা পর পর সাতবার তার পুনর্নির্মাণ করে থাকলে ভূমিকম্পের পর কেন তারা আর তার পুনর্নির্মাণ করল না?

(iv) রাইকস, ডেলস্, আরনেস্ট ম্যাকে, এস. আর. রাও, সাহানী প্রমুখেরা পতনের কারণ হিসেবে বন্যার উপর গুরুত্ব আরােপ করেন। এম. আর. সাহানী -র মতে “Floods may have swept the Indus Culture.” রাইকস বলেন যে, “সিন্ধু নদের জল অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে ক্রমাগত বন্যা ও প্লাবন হচ্ছিল, এবং এর ফলেই সিন্ধু সভ্যতার বিলােপ ঘটেছিল।” সিন্ধু নদের বুকে পলি জমে নদীগর্ভ উঁচু হয়ে ওঠে। এর ফলে বর্ষায় নদীর জল দুকূল ছাপিয়ে শহরকে প্লাবিত করতে থাকে। মহেঞ্জোদারাে নগরটি যে অন্তত তিনবার বন্যার দ্বারা প্লাবিত হয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বন্যার হাত থেকে মহেঞ্জোদারাের নগরদুর্গকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ৪৩ ফুট চওড়া একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং দুর্গ সংলগ্ন পয়ঃপ্রণালীর উচ্চতা ১৪ ফুট বাড়ানাে হয়। শহরে বাড়ির ভিতরে যাতে জল ঢুকতে না পারে, সেজন্য বাড়ির ভিত উচু করা হয় এবং বাড়ির যে সব অংশে বন্যার জল লাগতে পারে, সে সব অংশ পােড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি করা হয়। চানহদারাে, লােথাল, দেশলপার, রংপুর, ভগতরব প্রভৃতি স্থানে বন্যার চিহ্ন স্পষ্ট। আবার অন্যদিকে হরপ্পা, কালিবঙ্গান প্রভৃতি স্থানে নগর ধ্বংসের জন্য বন্যার কোনও ভূমিকা নেই। অনেকে মনে করেন যে, কেবলমাত্র বন্যা এত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিব্যাপ্ত এই সভ্যতার বিনাশ ঘটাতে পারে না। রাইকস্ বলেন যে, কোনও সাধারণ বন্যা নয় — ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তনজনিত একটি ভয়াবহ বন্যাই হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস করেছিল। আবার অনেকের মতে, এ ধরনের বন্যার কোনও ভূ-তাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।

(v) প্রত্নতাত্ত্বিক পােজেল বলেন যে, সিন্ধুবাসীরা নিজেদের প্রয়ােজনে দীর্ঘ পাঁচশো বছর ধরে এই অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলকে নির্মমভাবে ব্যবহার করেছিল। এর ফলে এমন একটা সময় এসেছিল যখন আর জীবনধারণের জন্য জমিতে প্রয়ােজনীয় ফসল উৎপন্ন হচ্ছিল না এবং ক্রমাগত ধ্বংস হওয়ায় জীবজন্তুদের বংশও লােপ পেয়েছিল। এর ফলে এই অঞ্চলে প্রবল খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং হরপ্পা সভ্যতা বিলুপ্ত হয়। এই বক্তব্য গ্রহণযােগ্য নয় কারণ হরপ্পা সংস্কৃতি পাঁচশাে বছরের অনেক বেশি দিন স্থায়ী হয়েছিল, এবং পাঁচশাে বছরের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে কৃষি উৎপাদন নিঃশেষিত হয়ে যাবে — এ যুক্তিও গ্রহণযােগ্য নয়।

(২) বর্বর সংস্কৃতির প্রভাব: হরপ্পা সভ্যতায় লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাই বড়াে বড়াে ঘরগুলি ছােটো ছােটো আকারে ভাগ করা হচ্ছিল। ইতিমধ্যে বিভিন্ন অনগ্রসর এলাকায় হরপ্পা সংস্কৃতির দ্রুত প্রসার লাভের ফলে ওইসব অঞ্চলের বর্বরতা এই সংস্কৃতিকে গ্রাস করে। এর ফলে হরপ্পা সংস্কৃতি মলিন ও জীর্ণ হয়ে পড়ে। এই মত এখনও পর্যন্ত অনুমানমাত্র — তবে সাধারণভাবে বলা চলে যে, এই সংস্কৃতির অবনতি এবং অবসানের জন্য অভ্যন্তরীণ কারণ যতটা দায়ী ছিল, বিদেশিদের আক্রমণ ততটা দায়ী ছিল না।

(৩) আর্য আক্রমণ: বলা হয় যে, বন্যা, মহামারী, সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন বা জলবায়ু পরিবর্তন — যে কোনও কারণেই হােক না কেন, হরপ্পা সভ্যতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, এবং শেষপর্বে তার পতন ঘটেছিল রক্তাক্ত পথে। বলা হয় য়ে, সিন্ধু উপত্যকায় খননকার্য চালিয়ে রান্নাঘর, কুয়াের ধার, রাস্তা প্রভৃতি স্থানে যত্রতত্র স্থূপীকৃত কঙ্কাল পাওয়া গেছে — যাদের মাথার পিছনে ভারী অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন। এইসব মৃতদেহগুলির কোনও সৎকার হয় নি। অনেকে মনে করেন যে, রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের ফলেই হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটেছিল, এবং বিভিন্ন স্থানে সৎকার না হওয়া স্তুপীকৃত মৃতদেহগুলি হল তারই প্রমাণ।

হুইলার, স্টুয়ার্ট পিগট, গর্ডন চাইল্ড, অলচিন-দম্পতি প্রমুখ মনে করেন যে আর্যদের আক্রমণের ফলে এই সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই মতবাদের সমর্থনে কিছু যুক্তি উপস্থিত করা হয়।

(i) ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং মাথার খুলিতে আঘাতের চিহ্নসহ সৎকার না হওয়া স্তুপীকৃত মৃতদেহগুলি প্রমাণ করে যে, আকস্মিক আক্রমণের ফলে এইসব নগরবাসী নিহত হয়েছিল। পণ্ডিতদের মতে আর্যরাই ছিল আক্রমণকারী।

(ii) ভারতে আর্যদের আগমনকাল এবং হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের সময় অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। এ দুটির সময়কাল আনুমানিক ১৫০০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

(iii) ঋগ্বেদে বর্ণিত ‘হরিযূপীয়ার যুদ্ধ’ -কে হুইলার সহ অনেকেই হরপ্পার যুদ্ধ বলে মনে করুন।

(iv) ঋগ্বেদে দেবরাজ ইন্দ্রকে পুরন্দর বা নগরের ধ্বংসকারী বলে অভিহিত করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, আর্যদের আক্রমণকালে ভারতে হরপ্পা সভ্যতা ব্যতীত অপর কোনও নগর সভ্যতা ছিল না।

(v) চানহুদারাে, ঝুকর প্রভৃতি স্থানে তামা ও ব্রোঞ্জের তৈরি এক ধরনের ঋজু ও লম্বা কুঠার পাওয়া গেছে। স্থানীয় কুঠারের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই, বরং ইরানীয় কুঠারের সঙ্গে এর মিল আছে। যেহেতু আর্যরা ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল, তাই এই কুঠারকে আর্যদের কুঠার বলে মনে করা হয়।

এই মতবাদের কিছু দুর্বলতা আছে।

(i) মহেঞ্জোদারােতে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলি দ্বারা একমাত্র আর্য আক্রমণ প্রমাণিত হয় না। এর জন্য গৃহযুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি কারণকেও দায়ী করা যায়।

(ii) আর্য আক্রমণে মহেঞ্জোদারাে ধ্বংস হলেও সিন্ধুর অন্যান্য শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রমাণ নেই।

(i) আক্রমণকারীরা যে আর্য ছিল তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। ম্যাকে -র মতে আক্রমণকারীরা ছিল বেলুচিস্তানের অধিবাসী। সুতরাং আর্য আক্রমণ তত্ত্ব সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়।

হরপ্পা সভ্যতার পতনের জন্য কোনও একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। তবে এর পতনের জন্য যে কারণই দায়ী থাক না কেন, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, অভ্যন্তরীণ অবক্ষয় এর প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্য কোনও কারণ, যা এই সভ্যতার সমাধি রচনা করে।