Huns Domination: উত্তর ভারতে হুন আধিপত্য

হুন নেতা তোরমান
হুন নেতা তোরমানের প্রতিকৃতি মুদ্রায়

স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর গুপ্ত সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বর্বর হুনদের (Huns) ক্রমাগত আক্রমণের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রাণশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। গান্ধার ও পাঞ্জাব থেকে মালব পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হুনদের আধিপত্য (Huns Domination) প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষীয়মান গুপ্ত সম্রাটদের দুর্বলতার সুযােগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। পরস্পর-বিবদমান এইসব রাজ্যগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল মালব, কনৌজ, বঙ্গদেশ, সৌরাষ্ট্র, আসাম, থানেশ্বর প্রভৃতি।

এইসব রাজ্যগুলির পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক সংহতি চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতের রাজনৈতিক সংহতি বিনষ্ট হয়েছিল এবং ভারত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়েছিল। গুপ্ত শাসন ভারতের এক বৃহত্তর অংশে আবার রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। গুপ্তদের পতনের ফলে সেই ঐক্য বিনষ্ট হয়। সপ্তম শতকের সূচনায় থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রিঃ) কিছুদিনের জন্য উত্তর ভারতের এক বিরাট অংশকে ঐক্যবদ্ধ করেন। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর সেই ঐক্য আবার বিনষ্ট হয়।

আদি পরিচয়: খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে হিউং-নু বা হুনরা চিন সীমান্তে বাস করত। তারা ছিল অতি দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির যাযাবর উপজাতি। হত্যা ও লুণ্ঠন ছিল তাদের সহজাত। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে তারা উত্তর-পশ্চিম চিন থেকে ইউ-চি নামে অপর বর্বর জাতিকে বিতাড়িত করে ওই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।

এর কিছুদিন পর তৃণভূমির সন্ধানে হুনরা আবার পশ্চিমদিকে অগ্রসর হয়। এ সময় তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়। একটি দল ইউরােপে প্রবেশ করে এবং রােমান সাম্রাজ্য ধ্বংস করে। তারা কৃষ্ণ হুন (Black Huns) নামে পরিচিত। তাদের নেতা ছিলেন এ্যাটিলা (Attila)। তাদের অপর শাখা খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে আমুদরিয়া বা অক্ষু নদীর (Oxus) উপত্যকায় বসতি নির্মাণ করে। তারা শ্বেত হুন (White Huns or Ephthalies) নামে পরিচিত।

স্কন্দগুপ্তের রাজত্বকালের সূচনা-পর্বে তারা ভারতের পশ্চিমাঞ্চল আক্রমণ করে। স্কন্দগুপ্ত তাদের প্রতিহত করলে তারা ক্রমে কাবুল ও পারস্য অধিকার করে এবং পারস্যের সাসানীয় বংশের অধিপতি ফিরােজ তাদের হাতে নিহত হন (৪৮৫ খ্রিঃ)। কাবুল ও পারস্য জয়ের ফলে হুনদের শক্তি প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বলখ -কে কেন্দ্র করে তারা বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তােলে।

তােরমান: স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতার সুযােগে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষভাগে হূনরা আবার ভারতের উপর আক্রমণ হানে। এই সময় হূনদের নেতা ছিলেন তােরমান। পাঞ্জাব, রাজপুতানা ও পূর্ব মালবে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের এই আধিপত্য অবশ্য স্থায়ী হয় নি। এরান শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি ৫১০ খ্রিস্টাব্দে গুপ্ত সম্রাট ভানুগুপ্তের হাতে পরাজিত হন। অষ্টম শতকে রচিত ‘কুবলয়মালা’ নামক জৈন গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, তিনি শেষ বয়সে জৈন ধর্ম গ্রহণ করেন এবং চেনাব নদীর উপকূলে বাস করতে থাকেন।

মিহিরকুল: তােরমানের পুত্র মিহিরকুল (বা মিহিরগুল) খুব শক্তিশালী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল শাকল বা শিয়ালকোট। ঘােরতর বৌদ্ধবিদ্বেষী মিহিরকুল বহু বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির ধ্বংস করেন। হিউয়েন সাং, চৈনিক দূত সং-ইয়ুং এবং কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’ মিহিরকুলের নিষ্ঠুরতা ও রাজ্যজয়ের কথা জানা যায়। হিউয়েন সাঙের মতে, মিহিরকুল সমগ্র ভারত জয় করেছিলেন। রাজতরঙ্গিনীর মতে গান্ধার, কাশ্মীর, দক্ষিণ ভারত ও সিংহল তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। বলা বাহুল্য, এ সবই অতিশয়ােক্তি। তবে এ কথা ঠিকই যে, গােয়ালিয়র পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। পশ্চিম মালবে মান্দাশোরের অধিপতি যশােধর্মনের (Yasodharman) মান্দাশাের লিপি থেকে জানা যায় যে, মিহিরকুল মধ্য ভারতে রাজ্যবিস্তারে উদ্যোগী হলে তিনি তাকে পরাজিত করে মধ্য ভারত থেকে হুন আতঙ্ক দূর করেন। হিউয়েন সাঙ বলেন যে, গুপ্ত সম্রাট নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য মিহিরকুলকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন (৫৩৩ খ্রিঃ)। এর ফলে মধ্য ভারতে হুন প্রভুত্বের অবসান ঘটে এবং পরাজিত মিহিরকুল কাশ্মীরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। প্রবল বৌদ্ধবিদ্বেষী মিহিরকুল শিবের উপাসক ছিলেন। গােয়ালিয়র লিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি একটি সূর্যমন্দির নির্মাণ করেন।

হূনদের পতন: মিহিরকুলের মৃত্যুর (৫৪২ খ্রিঃ) পর যােগ্য নেতার অভাবে হুনশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে কয়েকটি গােষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে তারা রাজত্ব করতে থাকে। থানেশ্বরের পুষ্যভূতি এবং কনৌজের মৌখরি (Maukhari), বংশের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বলতা সত্ত্বেও খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের শেষ পর্যন্ত ভারতে তাদের উপদ্রব অব্যাহত ছিল।

গুরুত্ব: ড: স্মিথ বলেন যে, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের হুন আক্রমণ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক যুগান্তর ঘটায়।

প্রায় শতবর্ষব্যাপী হূন আক্রমণ গুপ্ত সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয় এবং এই দুর্বলতার সুযােগে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বেশ কিছু স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এক কথায়, হূন আক্রমণ গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে। হূন আক্রমণের ফলে বহু প্রাচীন মঠ, মন্দির ও শিল্প-নিদর্শন — এমনকী বহু ঐতিহাসিক দলিলপত্র বিনষ্ট হয়।

হূন আক্রমণ ভারতীয় সমাজ-জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। হুনদের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার বহু উপজাতি ভারতে প্রবেশ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের নানা স্থানে বসতি স্থাপন করে। কালক্রমে ভারতীয় ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে এবং ভারতীয়দের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে তারা ভারতীয় সমাজে মিশে যায়। অনেকে বলেন যে, গুর্জর ও হুন জাতির সংমিশ্রণে রাজপুত জাতির সৃষ্টি হয়। হিন্দু সমাজে বিদেশিদের অনুপ্রবেশের ফলে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং বর্ণপ্রথা কঠোরতর হয়।