তৈমুর লং এর ভারত আক্রমণ

তুঘলক বংশের শেষ সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে সমরখন্দের দুর্ধর্ষ সামরিক নেতা তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করেন। তার পিতা আমির তার্ঘি ছিলেন চাঘতাই তুর্কি গোষ্ঠীর মানুষ এবং কেচ নামক ক্ষুদ্র অঞ্চলের অধিপতি। তৈমুর লং ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে সমরখন্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং পিতার মৃত্যুর পর ১৩৬১ খ্রিস্টাব্দে তেত্রিশ বছর বয়সে পৈতৃক রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। ক্ষুদ্র পৈতৃক রাজ্য নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি অচিরেই মেসােপটেমিয়া, পারস্য ও আফগানিস্তান জয় কর একজন সমরকুশলী বীররূপে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। যুদ্ধের সময় তার একটি পা নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি খুড়িয়ে হাঁটতেন। এই কারণে তার নামের সঙ্গে লং বা খোঁড়া শব্দটি যুক্ত হয়। এরপর তিনি ভারত অভিযানে অগ্রসর হন।

তাঁর আত্মজীবনী তুজক-ই-তৈমুরি থেকে তার ভারত অভিযানের দুটি উদ্দেশ্যের কথা জানা যায়— (১) বহুদেবতা ও পৌত্তলিকতায় আচ্ছন্ন ভারতীয়দের সত্যধর্মে দীক্ষিত করা এবং (২) ভারতের অমিত ধন-ঐশ্বর্য লুণ্ঠন করা। আসলে ভারত অভিযানের ভারতের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করাই ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য— পৌত্তলিকতার বিনাশ সাধন ছিল একটি অজুহাত মাত্র। মধ্য এশিয়া থেকে এত দূরদেশে অভিযানে আসতে তার সেনাবাহিনী ও আমির ওমরাহরা আপত্তি জানালে তাদের সামনে তিনি ধর্মের ধুয়া তুলে ধরেন।

১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দের গােড়ার দিকে তৈমুরের পৌত্র পীর মহম্মদ মুলতান দখল করেন। ওই বছরের এপ্রিল মাসে তৈমুর লং সমরখন্দ থেকে বিশাল সেনাবাহিনী সহ যাত্রা করে সিন্ধু, ঝিলাম ও রাভী নদী অতিক্রম করে রাজধানী দিল্লি অভিমুখে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে দীপালপুর, ভাতনার, শিরসা, কৈথাল প্রভৃতি স্থান লুঠ করে এবং বহু নরনারীকে হত্যা করে তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে হাজির হন (ডিসেম্বর, ১৩৯৮ খ্রি:)। সেখানে প্রায় একলক্ষ মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়।

দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী মল্লু ইকবাল তাকে প্রতিরােধ করতে অগ্রসর হন। তার কাছে পরাজিত হয়ে মল্লু ইকবাল বরণ প্রদেশে এবং সুলতান গুজরাটে পলায়ন করেন। এরপর দিল্লিতে প্রবেশ করে (১৮ই ডিসেম্বর, ১৩৯৮ খ্রিঃ) তৈমুর ও তাঁর সেনাদল দীর্ঘ পনেরাে দিন ধরে যে ধরনের লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালায় ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। তাদের হাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। জনৈক ঐতিহাসিক লিখছেন যে, হিন্দুদের ছিন্নমুণ্ড দিয়ে সৌধ নির্মাণ করে তৈমুরের সেনাদল উল্লাস প্রকাশ করে। নরদেহগুলি মাংশাসী পশু ও পাখির খাদ্যে পরিণত হয়। এরপর তিনি প্রভূত ধনরত্ন ও অসংখ্য বন্দি-সহ স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করেন (১৩৯৯ খ্রিঃ)। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে পথে ফিরােজাবাদ, মিরাট, হরিদ্বার ও জম্মু অঞ্চলে তার সেনাবাহিনী লুণ্ঠন চালায় এবং তিনি কাংড়া দখল করেন। ভারত ত্যাগের পর্বে তিনি খিজির খান -কে মুলতান, লাহাের ও দীপালপুরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে যান (৬ই মার্চ, ১৩৯৯ খ্রিঃ)।

তৈমুরের ভারত আক্রমণের ফলে কেবলমাত্র উত্তর ভারতের জনজীবন ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নি — সারা দেশ জুড়ে এক চরম নৈরাজ্য ও অরাজকতার সূত্রপাত হয়। তার সীমাহীন লুণ্ঠনের ফলে ভারত থেকে প্রচুর সােনা, রূপা, মণি-মুক্তা বিদেশে চলে যায়। আর্থিক দিক থেকে ভারত নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তৈমুরের বর্বরােচিত আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্ভিক্ষ, অনাহার ও মহামারি। দিল্লি নগরী শ্মশানে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক বদাউনি লিখেছেন যে, তৈমুরের হাত থেকে যারা নিষ্কৃতি পেয়েছিল তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রাণ হারায় এবং এর ফলে দিল্লির জনসংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে দিল্লির আকাশে দুমাস ধরে একটি পাখিকেও উড়তে দেখা যায় নি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে গবাদি পশুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এর ফলে দেশে অজন্মা দেখা দেয় এবং খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করে। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ফলে দেশের বাবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। সমগ্র উত্তর ভারতে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রদেশগুলি একে একে স্বাধীনতা ঘােষণা করে এবং সুলতানি সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।

তৈমুরের আক্রমণের পর নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহ গুজরাট থেকে দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং এক সংকীর্ণ রাজ্যাংশের উপর রাজত্ব করতে থাকেন। দিল্লি সুলতানির আধিপত্য তখন কেবলমাত্র দিল্লি, রােটাক, দোয়াব ও সম্বল অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর দিল্লির ওমরাহগণ দৌলত খান লােদি নামে জনৈক আফগান ওমরাহকে সিংহাসনে বসান। এর ফলে ভারতে দুশো বছরেরও বেশি সময়ের তুর্কি শাসনের অবসান ঘটে। দৌলত খা লােদিকে পরাজিত করে তৈমুরের প্রতিনিধি খিজির খান দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

তৈমুর লং কোথাকার রাজা ছিলেন?

কেচ নামক অঞ্চলের রাজা ছিলেন।

তৈমুর লং কবে ভারত আক্রমণ করেন?

১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে ভারত আক্রমণ করেন ।

তৈমুর লং এর পিতার নাম কি?

তৈমুর লং এর পিতার নামআমির তার্ঘি।

তৈমুর ভারত আক্রমণ কালে সুলতান কে ছিলেন?

দিল্লির সুলতান ছিলেন নাসিরউদ্দিন মহম্মদ।