লোদী বংশের ইতিহাস (Lodi Dynasty)

লােদিরা ছিল আফগান জাতীয়। ত্রয়ােদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তাদের অনেকেই সুলতানি সেনাদলে যােগদান করে। খলজি ও তুঘলক শাসনকালে কোনও কোনও আফগান ওমরাহ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফিরােজ তুঘলকের আমলে বেশ কিছু আফগান জমিদারের আবির্ভাব হয়। নাসিরউদ্দিন মহম্মদের রাজত্বকালে সুলতানি সেনাদলের একটি বড়াে অংশেই ছিল আফগান।

বহলুল লোদী (১৪৫১-১৯৮৯ খ্রি)

সুলতান ফিরােজ তুঘলকের শাসনকালে লোদী বংশীয় মালিক বহরাম লােদি ভারতে আসেন। বহলুল লােদি হলেন বহরাম লােদির পৌত্র। সৈয়দ বংশীয় সুলতান মহম্মদ শাহের শাসনকালে (১৪৩৪-১৪৪৫ খ্রিঃ) বহলুল ছিলেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা। সৈয়দ বংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের উজির হামিদ খানের আহ্বানে তিনি দিল্লি আক্রমণ কারন। সুলতান আগেই দিল্লি ত্যাগ করে বদাউনে চলে যান। বহলুল লােদি বিনাযুদ্ধে দিল্লিতে প্রবেশ করে আলাউদ্দিন আলম শাহকে দিল্লির সিংহাসন গ্রহণ করার অনুরােধ জানান। তিনি সম্মত না হওয়ায় বহলুল লােদি সিংহাসনে বসেন।

সুদক্ষ শাসক বহলুল উপলব্ধি করেন যে দিল্লি সুলতানিকে তার হৃতমর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা, স্বাধীন প্রদেশগুলিকে দিল্লি সুলতানির অন্তর্ভুক্ত করা বা তৎকালীন পরিবেশে বলবনের নীতি অনুযায়ী সুলতানের মর্যাদা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের কোনও চেষ্টা তিনি করেন নি। স্বাধীনচেতা আফগান সর্দাররা বহলুলকে সুলতানের মর্যাদা দিতে রাজি ছিল না— তারা তাকে আফগান আমিরদের মধ্যে প্রধান বলে মনে করত। এজন্য তিনি কোনও রাজকীয় উপাধি ধারণ করেন নি। সিংহাসনে বসে তিনি প্রথমেই সৈয়দ বংশীয় সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের উজির এবং তার ক্ষমতালাভের প্রধান সহায়ক বৃদ্ধ হামিদ খানকে কারারুদ্ধ করেন। আফগান আমির ও অভিজাতদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য তিনি তাদের জায়গির ও বিভিন্ন উচ্চপদ দান করেন। তিনি মুলতান, মেওয়াট ও দোয়াব অঞ্চলে বিদ্রোহের সম্ভাবনা নির্মূল করেন।

তার মুলতান অভিযানের সময় জৌনপুরের সুলতান মামুদ শর্কি দিল্লি আক্রমণ করলে তিনি দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং মামুদ শর্কি -কে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করেন। তার এই সাফল্যের ফলে লােদি শাসন সম্পর্কে সবার মনে উচ্চ ধারণার সৃষ্টি হয় এবং নতুন সুলতানের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মামুদ শর্কির মৃত্যুর পর তার পুত্র হােসেন শাহ শর্কি দিল্লির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করলে বহলুল লােদি তাকে পরাজিত করে জৌনপুরকে দিল্লির অন্তর্ভুক্ত করেন। সুলতান-পুত্র বরবক শাহ এই নববিজিত প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। কাল্পি, ঢােলপুর ও গােয়ালিয়র পর্যন্ত সুলতানের আধিপত্য বিস্তৃত হয়। ১৪৮৯ খ্রিস্টাব্দে গােয়ালিয়র বিজয়ের পর দিল্লি ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান।

ব্যক্তিজীবনে বহলুল লােদি ছিলেন অনাড়ম্বর, দয়াবান, ন্যায়পরায়ণ ও উদার। তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপােষকতা করতেন। তিনি বহুলাংশে দিল্লি সুলতানির মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন।

সিকান্দার লোদী (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রিঃ)

বহলুল লােদির মৃত্যুর পর আমির ওমরা সহযোগিতায় তার তৃতীয় পুত্র নিজাম খান ‘সিকান্দার শাহ লােদি’ নাম নিয়ে ১৪৮৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তুঘলক পরবর্তী যুগে তিনিই ছিলেন দিল্লির সবচয়ে উল্লেখযােগ্য, যােগ্যতাসম্পন্ন এবং সফল সুলতান।

এই সময় বহলুল লােদির জ্যেষ্ঠপুত্র এবং জৌনপুরের শাসনকর্তা বরবক শাহ জৌনপুরে নিজেকে স্বাধীন সুলতান বলে ঘােষণা করেন। সিকান্দার শাহ অগ্রজের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠালে তিনি বশ্যতা স্বীকার করেন এবং দিল্লির অধীনস্থ শাসনকর্তা হিসেবে জৌনপুর শাসন করতে থাকেন। ইতিমধ্যে তার অপদার্থতা ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জৌনপুরের আমির ও জমিদাররা বিদ্রোহ ঘােষণা করলে সিকান্দার শাহ তাকে পদচ্যুত করেন এবং যাতে তিনি কোনও সঙ্কট সৃষ্টি করতে না পারেন, এজন্য তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। জৌনপুরের আমিররা এতেও সন্তুষ্ট হন নি। তারা বিহারে অবস্থানরত জৌনপুরের ভূতপূর্ব শাসক হােসেন শাহ শর্কিকে সিংহাসন পুনরাধিকারের জন্য আহ্বান জানান। সিকান্দার লােদি তাকে পরাজিত করেন। অতঃপর তিনি ত্রিহুত ও বিহার জয় করেন।

এরপর তিনি বাংলা আক্রমণ করেন। শেষ পর্যন্ত বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হােসেন শাহ ও সিকান্দার লােদির মধ্যে এক অনাক্রমণ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় (১৪৪৫ খ্রিঃ) তাদের মধ্যে আর সংঘর্ষ হয় নি। উভয় সুলতানই পরস্পরের রাজ্য আত্ৰমণ না করা এবং অপরের প্রতিপক্ষকে নিজ রাজ্যে আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। তিনি ঢােলপুর, নারওয়ার, চন্দেরি ও নাগপুর জয় করেন।

তিনি শক্তিশালী, দৃঢ়চেতা, ন্যায়পরায়ণ ও যােগ্য শাসক ছিলেন। সকল প্রকার বিদ্রোহ দমন করে তিনি সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনেন। তিনি উদ্ধত ও স্বাধীনচেতা আমির-ওমরাহদের নিজ নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং তারা স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তারা সুলতানের সমকক্ষ নন — ভৃত্য মাত্র। প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন আনলেও তিনি সরকারি আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব রক্ষা ও তার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। হিসেবের গােলমাল বা তহবিল তছরূপের ঘটনা ঘটলে তিন কঠোর শাস্তি দিতেন। সাম্রাজ্যের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য গুপ্তচর ব্যবস্থা শক্ত করা হয়। তার বিচারব্যবস্থা ছিল পক্ষপাতহীন। দরিদ্র ও অনাথদের প্রতি তার সজাগ দৃষ্টি ছিল। কৃষি ও বাণিজ্যের সুবিধার জন্য তিনি বহু অপ্রয়ােজনীয় কর — শস্যকর, আন্তঃপ্রাদেশিক শুল্ক প্রভৃতি তুলে দেন। এর ফলে প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়।

তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। বহু মুসলিম পণ্ডিত ও ধর্মজ্ঞানী তার পৃষ্ঠপােষকতা অর্জন করেন। তিনি নিজে একজন সাহিত্যিক ও কাব্যরসিক ছিলেন। তিনি ‘গুলরুখ’ বা লালফুল ছদ্মনামে ফারসি কবিতা লিখতেন। তার নির্দেশে সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত গ্রন্থ ফারসি ভাষায় অনুদিত হয় (ফার-হাংগ-ই-সিকন্দরী)। তিনি শিল্পকলারও পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। আগ্রা নগরীর গোড়াপত্তন তার এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি। তিনি এই নগরীটিকে প্রাসাদ, মক্তব ও মাদ্রাসা দ্বারা শােভিত করেন।

হিন্দু মাতার সন্তান হয়েও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি অনুদার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেন এবং মন্দিরের উপর মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি বলপূর্বক এবং উপঢৌকনের লােভ দেখিয়ে বহু মানুষকে ধর্মান্তরিত করেন। হিন্দুদের যমুনা নদীতে পুণ্যস্নানে বাধা দেওয়া হয় এবং হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ক্ষৌরকার্য না করার জন্য নাপিতদের নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি নগরকোটের জালামুখী মন্দিরের মূর্তিগুলিকে টকরাে টুকরাে করে কসাইখানায় বাটখারা হিসেবে বাবহারের নির্দেশ দেন। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতিক্রিয়া ভালাে হয় নি। তৈমুর লঙের আক্রমণের পরবর্তীকালে ভারত ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা হয়। এ যুগ হল হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির যুগ — ভক্তি আন্দোলনের যুগ। এই যুগের প্রেক্ষাপটে সিকান্দার লােদির এই আচরণের কোনও যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ডঃ এ. বি. পাণ্ডে বলেন যে, তার সকল ত্রুটি ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও সিকান্দার লোদী ছিলেন নিঃসন্দেহে লোদী বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি।

ইব্রাহিম লােদি (১৫১৭-১৫২৬ খ্রিঃ)

সিকান্দার লােদির মৃত্যুর পর তার পুত্র ইব্রাহিম লােদি বিনা বাধায় সিংহাসনে বসেন। পিতার যােগ্যতা ও দূরদর্শিতা তার ছিল না। শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি কোনওভাবেই শ্রেণিবিশেষের স্বার্থরক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন না। শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা এবং অভিজাতদের ক্ষমতা হ্রাস করার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁদের সম্পর্কে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। এর ফলে অভিজাত সম্প্রদায় সুলতানের উপর রেগে গিয়ে বিরোধিতা শুরু করে।

আফগান আমিররা সুলতানের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জালাল -কে জৌনপুরের স্বাধীন সুলতান বলে ঘােষণা করে এবং তাকে দিল্লির সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেয়। জালাল খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। আফগান আমিররা তাদের ক্ষমতা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তাদের নেতা পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খাঁ লােদি এবং সুলতানের পিতৃব্য ও গুজরাটের শাসনকর্তা আলম খা লােদি কাবুলের অধিপতি বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। জাতির এই দুর্দিনে ভারতে পুনরায় হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার আশায় মেবারের অধিপতি সংগ্রাম সিংহ নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেন। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের কাছে ইব্রাহিম লােদি পরাজিত ও নিহত হন। এইভাবে ভারতের বুকে তিন শতাব্দীর অধিককাল স্থায়ী দিল্লি সুলতানির পতন ঘটে এবং ভারতে মােগল যুগের সূত্রপাত হয়।

লোদী বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

লোদী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বহলুল লোদী।

লোদী বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক কে ছিলেন?

লোদী বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন সিকান্দার লোদী।

লোদী বংশের সর্বশেষ শাসক কে ছিলেন?

লোদী বংশের সর্বশেষ শাসক ছিলেন ইব্রাহিম লোদী।

ইব্রাহিম লোদীর ভাইয়ের নাম কি?

ইব্রাহিম লোদীর ভাইয়ের নাম ছিল জালাল খান।