Maitraka Dynasty: বলভীর মৈত্রক বংশ

বলভীর মৈত্রক বংশ
৫৯০ খ্রিস্টাব্দে মৈত্রক অঞ্চলের আনুমানিক পরিমাণ

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শেষদিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের দিনে গুপ্তদের সেনাপতি ভট্টারক সৌরাষ্টের বলভীতে একটি স্বাধীন রাজ্য ও রাজবংশ প্রতিষ্ঠা বলেন। এই রাজবংশের নাম মৈত্ৰক বংশ  (Maitraka Dynasty)। মৈত্ৰক বংশের প্রতিষ্ঠাতা ভট্টারক ও তার পুত্র ধরসেন ‘সেনাপতি’ উপাধি গ্রহণ করেন। ধরসেনের পরবর্তী পাঁচজন রাজা— দ্রোনসিংহ, প্রথম ধ্রুবসেন, ধরপত্ত, গুহসেন ও দ্বিতীয় ধরসেন ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, মৈত্রক বংশীয় এইসব রাজন্যবর্গ গুপ্ত বা হুনদের (Huns) অধীনস্থ ছিলেন। গুপ্ত বা হুনদের পতনের পর তারা স্বাধীনতা ঘােষণা করেন।

দ্বিতীয় ধরসেনের পুত্র প্রথম শিলাদিত্য ছিলেন মৈত্ৰক বংশের প্রথম স্বাধীন নরপতি। তার রাজত্বকালের সময়সীমা ছিল সম্ভবত ৬০৬ থেকে ৬১২ খ্রিস্টাব্দ। তার রাজ্যের আয়তন সঠিকভাবে বিবৃত করা সম্ভব নয়, তবে তার রাজত্বকালে বলভী একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। হিউয়েন সাঙ তাকে সুদক্ষ ও দয়ালু শাসক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন।

রাজকাহিনী: থানেশ্বরের পুষ্যভূতি-বংশীয় হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক দ্বিতীয় ধ্রুবসেন ছিলেন মৈত্ৰক বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নরপতি। তিনি গুজরাট ও মালবের কিছু অংশ তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি হর্ষবর্ধনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পরাজিত হন। হর্ষবর্ধন পরাজিত ধ্রুবসেনের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। তিনি বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং হর্ষবর্ধনের আহ্বানে প্রয়াগের ধর্ম সম্মেলনে যােগদান করেন।

মৈত্ৰক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন চতুর্থ ধরসেন। তার রাজত্বকালে বলভী রাজ্য শক্তি ও মর্যাদার চরম শিখরে আরােহণ করে। তার রাজ্যের সীমা ভৃগুকচ্ছ বা বর্তমান ব্রোচ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি পরম ভট্টারক, মহারাজাধিরাজ, পরমেশ্বর, চক্রবর্তিন প্রভৃতি সম্রাট-মর্যাদাজ্ঞাপক উপাধি ধারণ করেন। তাঁর রাজসভা শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ‘ভট্টিকাব্য’ বা ‘রাবণবধ’ কাব্য রচয়িতা কবি ভট্টি তার সভাকবি ছিলেন। চতুর্থ ধরসেনের পর মৈত্ৰক বংশ আরও প্রায় একশাে বছর রাজত্ব করেছিল। এ সময় আরব আক্রমণ এবং চালুক্য, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট (Rashtrakutas) শক্তির উত্থানে অষ্টম শতকের তৃতীয় ভাগে এই রাজ্যটির পতন ঘটে।

বাণিজ্য কেন্দ্র: ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে বলভী অতি উল্লেখযােগ্য ছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে রাজধানী বলভী খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদেশে রপ্তানির জন্য এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যসামগ্রীর জন্য বলভীতে বহু গুদাম তৈরি হয়েছিল। অষ্টম শতকে ভৃগুকচ্ছ (বর্তমান ব্রোচ) মৈত্রক রাজাদের দখলে এলে নতুন একটি বাণিজ্যকেন্দ্র তাদের হাতে আসে। ভৃগুকচ্ছ পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও বলভী উল্লেখযােগ্য ছিল। হিউয়েন সাং ও ইংসিং -এর মতে বলভী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান এবং পূর্ব ভারতের নালন্দার মতােই তার খ্যাতি বহুদূর বিস্তৃত ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে সমবেত হতেন। কেবলমাত্র বৌদ্ধশিক্ষাই নয় — এখানে উন্নত মানের ব্রাহ্মণ্য শিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। মৈত্রক রাজন্যবর্গ ও ধনী বণিক সম্প্রদায় এই শিক্ষাকেন্দ্রে অর্থ সাহায্য করতেন। এখানকার বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে স্থিরমতি ও গুণমতি উল্লেখযােগ্য ছিলেন। বলভীর রাজারা শৈব ছিলেন। অনেকে আবার বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাদের পরধর্মসহিষ্ণু নীতির ফলেই বলভী বৌদ্ধশাস্ত্র শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।