সুলতানি রাষ্ট্রের প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা কেমন ছিল?

শাসনকার্যের সুবিধার জন্য সুলতানি সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। মুহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে এই প্রদেশগুলির সংখ্যা ছিল ২৩ টি। সুলতানি শাসনের সূচনা পর্বে ত্রয়ােদশ শতকে প্রায় একশাে বছর ধরে কতকগুলি সামরিক অঞ্চল নিয়ে সুলতানি সাম্রাজ্য গঠিত ছিল।

এই সামরিক অঞ্চলগুলি ইকতা নামে পরিচিত ছিল। ইকতা -র সামরিক শাসনকর্তাকে বলা হত মুকতি বা ইকতাদার। ইকতা -র শাসনকার্যে সুলতান কোনও প্রকার হস্তক্ষেপ করতেন না। আলাউদ্দিন খলজির সিংহাসনারােহণের পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তিনি ভারতের এক বিশাল অংশকে নিজ অধীনে আনেন এবং প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে উদ্যোগী হন।

আলাউদ্দিন খলজির আমলে তিন ধরনের প্রদেশের অস্তিত্ব দেখা যায়। (১) পূর্বতন ইকতা। (২) নববিজিতরাজ্যগুলিকে বৃহৎ বৃহৎ প্রদেশে পরিণত করা হয়। উদাহরণ হিসেবে গুজরাট, বাংলা, জৌনপুর, খান্দেশ প্রভৃতির কথা বলা যায়। এই প্রদেশগুলিতে নিযুক্ত সামরিক শাসনকর্তাদের বলা হত ওয়ালি। (৩) এছাড়া বেশ কিছু পরাজিত হিন্দুরাজা সামন্ত হিসেবে নিজ নিজ রাজ্য শাসন করতেন।

প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নিযুক্তি, পদচ্যুতি, বদলি — সবই নির্ভর করত সুলতানের ইচ্ছার উপর। এইসব শাসকরা নিজ নিজ প্রদেশের প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কার্য পরিচালনা করতেন, যুদ্ধকালে সুলতানকে সেনা সরবরাহ করতেন এবং নিজ নিজ প্রদেশের আয় ব্যয়ের হিসেব ও উদ্বৃত্ত আয় কেন্দ্রে পাঠাতেন।

প্রদেশগুলি কতকগুলি শিক বা জেলায় বিভক্ত ছিল। শিক -এর প্রধান ছিলেন শিকদার। শিক -গুলি কতকগুলি পরগনায় বিভক্ত ছিল। এর প্রধান ছিলেন আমিল। কতকগুলি গ্রাম নিয়ে পরগনা গঠিত ছিল। পরগনা ও গ্রাম শাসনে হিন্দু কর্মচারীরাই নিযুক্ত হতেন। এই যুগে কোনও হিন্দু প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত হন নি। প্রাদেশিক রাজধানীতে একমাত্র মুসলিম কর্মচারীরাই নিযুক্ত হতেন। গ্রামের শাসনভার ন্যস্ত ছিল গ্রামসভা বা গ্রাম পঞ্চায়েত এর উপর। চৌকিদার গ্রামের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করত। পাটোয়ারি রাজস্ব আদায় করত।

সুলতানি যুগের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রাক্ সুলতানি যুগের ভারতীয় শাসন ব্যবস্থার যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। উভয়ক্ষেত্রেই সুলতান বা রাজা ছিলেন শাসন ব্যবস্থা, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রধান। উভয়ক্ষেত্রেই একদল মন্ত্রী শাসনকার্য পরিচালনায় তাদের সাহায্য করত। শাসনকার্য পরিচালনায় নিচুস্তরে বিশেষ কোনও প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে নি। প্রশাসনিক পদগুলির নাম ছিল একই রকম এবং আগের মতােই একই পদ্ধতিতে একই শ্রেণির লােকজনদের দিয়ে ভূমিরাজস্ব আদায় করা হত। তুর্কিরা নিচুস্তরে একই ধরনের শাসন ব্যবস্থা বজায় রেখেছিল। এর ফলে তারা গ্রামাঞ্চলে দ্রুত আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়।