খলিফার সঙ্গে দিল্লির সুলতানদের সম্পর্ক কেমন ছিল?

ইসলামের বিধান অনুযায়ী বাগদাদের খলিফা হলেন মুসলিম জগতের প্রধান। তিনি হলেন মুসলিম জগতের প্রধান ধর্মগুরু এবং শাসক। বিশ্বের যে কোনও অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্র মাত্রই হল খলিফার বিশাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ, এবং তার মুসলিম শাসক হলেন খলিফার প্রতিনিধি। খলিফার অনুমােদন ব্যতীত কোনও মুসলিম রাষ্ট্র বা তার শাসক বৈধ বলে বিবেচিত হত না। ভারতের তুর্কি সুলতানরা খলিফার অনুমােদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, কারণ এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষ ও আমির ওমরাহের চোখে সুলতানের মর্যাদা বৃদ্ধি পেত এবং দিল্লির সুলতানরা সমমর্যাদার ভিত্তিতে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন। ত্রয়ােদশ শতক থেকে আব্বাসীয় খলিফাদের প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস পেলেও দিল্লির সুলতানরা রাজনৈতিক কারণে খলিফার আনুগত্য স্বীকার করতেন। ডঃ আবদুল করিম এর মতে, “ইহা নিছক রাজনৈতিক চাল ছিল এবং ইহা ছাড়া আব্বাসীয় খলিফাদের সঙ্গে তাহাদের অন্য কোনও সম্পর্ক ছিল না।”

দিল্লির সুলতানদের মধ্যে ইলতুৎমিস -ই সর্বপ্রথম আব্বাসীয় খলিফা মুসতানসির এর কাছে স্বীকতির জন্য আবেদন জানান। ১২২৯ খিস্টাব্দে তিনি খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতিপত্র বা মনশুর লাভ করেন। এরপর তিনি নিজেকে খলিফার অধীনস্থ বলে ঘােষণা করেন, নিজ মুদ্রায় খলিফার নাম অঙ্কিত করেন এবং খলিফার নামে খুৎবা পাঠের ব্যবস্থা করেন।

১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মােঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খাঁ -র পৌত্র হুলাকু আব্বাসীয় খলিফাকে হত্যা করে বাগদাদে খলিফার রাজত্বের অবসান ঘটালেও ভারতের সুলতানরা তাদের মুদ্রায় খলিফার নাম খােদাই করা এবং শুক্রবারের জুম্মা নামাজে তার নাম উচ্চারণ করার পদ্ধতি চালিয়ে যান।

১২৯৬ খিস্টাব্দে আলাউদ্দিন খলজি এই ব্যবস্থা ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তিনি মুদ্রায় খলিফার নাম খােদাই করার রীতি বন্ধ করেন এবং নিজেকে রাষ্ট্রনায়ক ও ধর্মনায়ক বলে মনে করতে থাকেন — এমনকী নিজে একটি নতুন ধর্ম প্রচারের কথাও চিন্তা করেন। আমির খসরু তাকে ‘খলিফা-ই-জামান’ বলে মনে করতেন। আলাউদ্দিন খলজির পুত্র মুবারক শাহ নিজেকে খলিফা বলে ঘােষণা করেন।

তুগলক বংশের প্রতিষ্ঠায় গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এর সিংহাসন আরােহণে এই ব্যবস্থায় আবার পরিবর্তন আসে। তিনি নাসির-ই-আমির-উল-মুজিনিন অর্থাৎ খলিফার সহকারী উপাধি ধারণ করেন।

গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের উত্তরাধিকারী মহম্মদ বিন তুঘলক তার রাজত্বের সূচনা পর্বে আলাউদ্দিনের নীতি অনুসরণ করে খলিফার প্রতি আনুগত্য দেখাতে অস্বীকার করেন। তিনি নিজ মুদ্রা থেকে খলিফার নাম অপসারিত করেন এবং নিজেকে আল্লাহের ছায়া বলে দাবি করতে থাকেন। তার রাজত্বের শেষদিকে সাম্রাজ্যের চতুর্দিকে বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি পুনরায় খলিফার আনুগত্য লাভে তৎপর হন। তিনি নিজ মুদ্রায় খলিফার নাম খােদাই করেন এবং মিশরে বসবাসকারী আব্বাসীয় খলিফার জনৈক বংশধরের কাছ থেকে স্বীকৃতিপত্রও লাভ করেন। মিশরীয় খলিফার জনৈক আত্মীয় দৌলতাবাদে এলে মহম্মদ বিন তুঘলক তাকে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানান।

ধর্মভীরু ফিরােজ শাহ তুঘলক পর পর দুবার মিশরবাসী খলিফার স্বীকৃতি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে সৈয়দ বা লাৈদি সুলতানরা খলিফার স্বীকৃতি অর্জনে আর তৎপর হন নি। মােগলরা এই বিষয়টিকে কোনও গুরুত্বই দেন নি — তারা নিজেদের মিশর, ইরান, তুরস্ক প্রভৃতি দেশের শাসকদের সমকক্ষ বলে মনে করতেন।

আসলে খলিফা বা খিলাফতের সঙ্গে দিল্লির সুলতানদের কোনও প্রত্যক্ষ বা স্পষ্ট সম্পর্ক ছিল না। বিশেষ উদ্দেশ্যে খলিফার প্রতি তারা নামমাত্র আনুগত্য জানাতেন। বাস্তবে তারা কারাে অধীনস্থ ছিলেন না — তারাই ছিলেন প্রকৃত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।