সৈয়দ বংশের ইতিহাস (Sayyid Dynasty)

সৈয়দ বংশ দিল্লি সালতানাতের চতুর্থ রাজবংশ। তৈমুরের আক্রমণের পর নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহ গুজরাট থেকে দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং এক সংকীর্ণ রাজ্যাংশের উপর রাজত্ব করতে থাকেন। দিল্লি সুলতানির আধিপত্য তখন কেবলমাত্র দিল্লি, রােটাক, দোয়াব ও সম্বল অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর দিল্লির ওমরাহগণ দৌলত খান লােদি নামে জনৈক আফগান ওমরাহকে সিংহাসনে বসান। এর ফলে ভারতে দুশো বছরেরও বেশি সময়ের তুর্কি শাসনের অবসান ঘটে। দৌলত খা লােদিকে পরাজিত করে তৈমুরের প্রতিনিধি খিজির খান দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

খিজির খান (১৪১৪-১৪২১ খ্রিঃ)

১৪১৩ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক বংশের শেষ নরপতি নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহের মৃত্যু ঘটলে দিল্লির আমির-ওমরাহরা দৌলত খানকে দিল্লির সিংহাসন সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর পরের বছর তৈমুরের ভারতীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ও মুলতানের শাসনকর্তা খিজির খান দিল্লির সিংহাসন দখল করেন (১৩১৪ খ্রিঃ)। এর ফলে দিল্লিতে তুর্কি শাসনের অবসান হয় এবং আফগান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

খিজির খান নিজেকে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের বংশধর বলে দাবি করতেন। এই কারণে তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ সৈয়দ বংশ নামে পরিচিত। তিনি নিজে কোনও রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেন নি। তিনি তৈমুরের পুত্র ও উত্তরাধিকারী শাখরুখের প্রতিনিধি হিসেবেই শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তার নিজের উপাধি ছিল ‘রায়ত-ই-আলা’ (প্রধান প্রজা)। তিনি মােট সাত বছর রাজত্ব করেন। তার রাজত্ব কেবলমাত্র দিল্লি, পাঞ্জাব ও দোয়াব অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং এই অঞ্চলটুকুর মধ্যেও কোনও প্রকার শৃঙ্খলা ছিল না।

মােবারক শাহ (১৪২১-১৪৩৪ খ্রিঃ)

তিনি সিংহাসনে বসে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দূর করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি সফল হন নি। তিনি ভাতিন্দা ও দোয়াব অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করে সেখান থেকে কর আদায়ে সক্ষম হন, কিন্তু পাঞ্জাবের খাের উপজাতিদের দমন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। তার রাজত্বকালে ইয়াহিয়া-বিন-সরহিন্দী ‘তারিখ-ই-মােবারকশাহি’ নামে ফারসি ভাষায় নিকটি প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থ সুলতানকে অমর করে রেখেছে। তিনি হিন্দু-মুসলিম অভিজাতবর্গের ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারান (১৩৩৪ খ্রিঃ)।

মহম্মদ শাহ (১৪৩৪-১৪৪৫ খ্রিঃ)

মােবারক শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র মহম্মদ শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অপদার্থ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ ব্যক্তি। এর ফলে তাঁর মন্ত্রী সাওয়ার-উল-মুলক সকল ক্ষমতা করায়ত্ব করেন। সাওয়ার-উল-মুলক এর মৃত্যুর পর সুলতান প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হলেন ঠিকই, কিন্তু তার ক্ষমতার অপব্যবহারে আমির ওমরাহ, অভিজাতবর্গ এবং প্রাদেশিক শাসনকর্তরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা সুলতানের বিরুদ্ধে জোট গঠন করেন। এই অবস্থায় মালবের শাসনকর্তা মামুদ খলজি দিল্লির বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে, গুজরাটের শাসনকর্তা বহলুল লােদি সুলতানের সাহায্যে অগ্রসর হন। মামুদ খলজি পরাজিত হয়ে ফিরে যান। সুলতান কৃতজ্ঞতাবশত বহলুল লােদিকে ‘খান-ই-খানান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুলতানের দুর্বলতার পরিচয় পেয়ে বহলুল লােদি নিজেই সিংহাসন দখলের চেষ্টা করেন। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ শাহের মৃত্যু ঘটলে অভিজাতবর্গ তার পুত্র আলাউদ্দিন আলম শাহকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করেন।

আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৪৫-১৪৫১ খ্রিঃ)

পিতার মৃত্যুর পর অভিজাতদের ইচ্ছায় আলাউদ্দিন আলম শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন এই বংশের সর্বাপেক্ষা অযােগ্য শাসক। অচিরেই তার সঙ্গে উজির হামিদ খানের বিবাদ শুরু হয়। তিনি সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা বহলুল লােদিকে দিল্লি আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। বহলুল লোদী দিল্লি অধিকার করেন। আলাউদ্দিন আলম শাহ তার উজিরকে হতাশ করার জন্য সমগ্র রাজ্যই বহলুলের হাতে তুলে দিয়ে বদাউনে চলে যান। সেখানে তিনি এক অতি সাধারণ কৃষকের মতাে জীবন নির্বাহ করেন। ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। এইভাবে সৈয়দ বংশের সাঁইত্রিশ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে। ডঃ নিজামি বলেন যে, মুলতানের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে উথিত হয়ে বদাউনের একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে সৈয়দদের পতন হয়। বলা বাহুল্য, ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এঁদের অবদান বলতে কিছুই নেই।

সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

সৈয়দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খিজির খান।

সৈয়দ বংশের শেষ সুলতান কে ছিলেন?

সৈয়দ বংশের শেষ সুলতান ছিলেন আলাউদ্দিন আলম শাহ।

সৈয়দ বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান কে ছিলেন?

সৈয়দ বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান ছিলেন মোবারক শাহ।