Shashanka of Gauda: গৌড়রাজ শশাঙ্ক কে ছিলেন?

Shashanka of Gauda: গৌড়রাজ শশাঙ্ক মুদ্রা
শশাঙ্ক দেবের মুদ্রা, গৌড়ের রাজা

প্রাচীনকালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। গুপ্ত যুগের পূর্বে বাংলার কোনও ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব হয় নি। অনেকের মতে গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল বাংলাদেশ। এই মত সত্য হলে শুরু থেকেই বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তা না হলে এলাহাবাদ প্রশস্তি অনুসারে সমতট (পূর্ববঙ্গ) বাদে সমগ্র বাংলা সমুদ্রগুপ্ত জয় করেন।

ষষ্ঠ শতকের প্রথমভাগে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কালে বাংলাদেশে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথমভাগে এইসব রাজ্যগুলির মধ্যে গৌড় (Gauda) রাজ্য সর্বাধিক খ্যাতি ও প্রভাব অর্জন করে। গৌড় রাজ্যের এই খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের (Shashanka) বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

উপাদান: গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক (৬০৬-৬৩৭ খ্রি:) সম্পর্কে কোনও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তথ্যের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় শশাঙ্কের বিরুদ্ধবাদী ঐতিহাসিকদের উপর। হর্ষের সভাকবি বাণভট্ট ও চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ -এর রচনা এবং বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমুলকল্পই হল তথ্যের উৎস। বাণভট্ট বা হিউয়েন সাং পরিবেশিত তথ্য পক্ষপাতদুষ্ট। বাণভট্ট ছিলেন হর্ষের আশ্রিত, আর হিউয়েন সাং হর্ষের দ্বারা উপকৃত। শশাঙ্কের কিছু মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিকদের সাহায্য করবে।

আদি পরিচয়: ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার -এর মতে, “বাঙালি রাজগণের মধ্যে শশাঙ্কই প্রথম সার্বভৌম নরপতি।” তার প্রথম জীবন বা তার বংশপরিচয় সম্পর্কে কোনও তথ্য জানা যায় না। অনেকের মতে তিনি গুপ্তবংশসম্ভূত ছিলেন এবং তার অপর নাম ছিল নরেন্দ্রগুপ্ত। এই মত ঐতিহাসিক মহলে স্বীকৃত নয়। আবার অনেকে অনুমান করেন যে, তিনি ‘পরবর্তী গুপ্ত বংশীয়’ (Later Gupta Dynasty) মগধরাজ মহাসেনগুপ্তের অধীনে সামন্ত ছিলেন। মহাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পর ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই তিনি গৌড়ে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই যুগে গৌড় বলতে উত্তর বাংলা ও পশ্চিম বাংলাকে বােঝাত। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ।

রাজ্যজয়: গৌড়ের স্বাধীন নৃপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরেই তিনি রাজ্যবিস্তারে মনােযােগী হন। দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গ তার অধিকারে ছিল কিনা সঠিকভাবে তা বলা দুরূহ — তবে বাংলার বাইরে অভিযান পাঠাবার পূর্বে নিশ্চয়ই সমগ্র বাংলার উপর তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দক্ষিণে দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুরের দাতন), উৎকল (বালেশ্বর অঞ্চল) ও কঙ্গোদ (উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলা) জয় করেন। পশ্চিমে মগধও তার সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, “শশাঙ্কের পূর্বে আর কোনও বাঙালি রাজা এইরূপ বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন বলিয়া জানা নাই।”

মৈত্রী জোট: সমগ্র বাংলা ও বিহার এবং উড়িষ্যার কিছু অংশ জয় করার পর শশাঙ্ক গৌড়ের শত্রু কনৌজের মৌখরি-বংশীয় (Maukhari Dynasty) রাজা গ্রহবর্মন -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। পরবর্তী গুপ্ত -দের আমল থেকে কনৌজের মৌখরিরা বারংবার বাংলার উপর আক্রমণ হানে। পরবর্তী গুপ্ত -দের উত্তরাধিকারী হিসেবে শশাঙ্ক -ও এই বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। গ্রহবর্মন থানেশ্বরের পুষ্যভূতি-বংশীয় রাজা প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রী -কে বিবাহ করেন। মৌখরি ও পুষ্যভূতি বংশের (Pushyabhuti Dynasty) মধ্যে এই বৈবাহিক সম্পর্ক বা শক্তিজোট মালব-রাজ দেবগুপ্তর পক্ষে অস্বস্তিকর ছিল, কারণ পুষ্যভূতিদের সঙ্গে মালব রাজবংশের শত্রুতা ছিল। এই কারণে দেবগুপ্ত শশাঙ্কের সঙ্গে মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হন। এইভাবে একটি পাল্টা শক্তিজোট গড়ে ওঠে।

শশাঙ্ক বনাম হর্ষ: দেবগুপ্ত ও শশাঙ্ক যৌথভাবে কনৌজ আক্রমণ করেন। গ্রহবর্মন পরাজিত ও নিহত হন (৬০৬ খ্রিঃ) এবং রাজ্যশ্রীকে কারারুদ্ধ করা হয়। থানেশ্বর-রাজ প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর (৬০৫ খ্রিঃ) পর থানেশ্বরের তরুণ নৃপতি রাজ্যবর্ধন তখন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই যুদ্ধে দেবগুপ্ত পরাজিত ও নিহত হন, কিন্তু বিপরীত দিকে রাজ্যবর্ধন আবার শশাঙ্কের হাতে নিহত হন। বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ বলেন যে, শশাঙ্ক বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন। ড রমেশচন্দ্র মজুমদার -এর মতে, শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে ন্যায়-যুদ্ধে পরাজিত করেন। এ ছাড়াও তিনি বলেন যে, বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ -এর বিবরণে নানা অসঙ্গতি আছে। ডা রাধাগােবিন্দ বসাক (R. G. Basak), ডঃ ডি. সি. গাঙ্গুলী (D. C. Ganguly) এবং অধ্যাপিকা দেবাহুতি (D. Devahuti) অবশ্য শশাঙ্কের বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। তবে সমকালীন রাজনৈতিক মানসিকতার প্রেক্ষাপটে শশাঙ্কের কাজ বিশ্বাসঘাতকতামূলক হলেও অনৈতিক ছিল না।

রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন (৬০৬ খ্রিঃ) এবং শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। শশাঙ্কের শক্তিবৃদ্ধিতে কামরূপ-রাজ (Kingdom of Kamarupa) ভাস্করবর্মন ভীত হয়ে হর্ষের পক্ষে যােগ দেন। বৌদ্ধগ্রন্থ ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ -তে বলা হচ্ছে যে, হর্ষ শশাঙ্ককে পরাজিত করেন। এ মত গ্রহণযােগ্য নয়। শশাঙ্ক ও হর্ষের মধ্যে কোনও যুদ্ধ সম্পর্কে বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ সম্পূর্ণ নীরব। এছাড়া আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প একটি বৌদ্ধগ্রন্থ এবং তা অনেক পরবর্তীকালের রচনা। বলা বাহূল্য, হর্ষ ও ভাস্করবর্মনের মিলিত শক্তিজোট শশাঙ্কের কোনও ক্ষতি করতে পারে নি। এবং ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, দণ্ডভুক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন।

ধর্মমত: শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন। বাণভট্ট, হিউয়েন সাঙ ও বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে তাকে বৌদ্ধধর্ম-বিদ্বেষী বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাণভট্ট শশাঙ্ককে ‘গৌড়াধম’ ও ‘গৌড়ভুজঙ্গ’ বলে অভিহিত করেছেন। হিউয়েন সাঙ বলেন যে, শশাঙ্ক বুদ্ধগয়ার পবিত্র বােধিবৃক্ষ ছেদন করেন এবং বৃক্ষের শিকড় উৎপাটন করেন। তিনি পাটলিপুত্রে বুদ্ধের চরণচিহ্ন অঙ্কিত প্রস্তরখণ্ড বিনষ্ট করেন এবং কুশীনগর বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেন। তার মতে এইসব অত্যাচারের পাপেই নাকি শশাঙ্ক দুরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ডঃ নীহাররঞ্জন রায় ও রাধাগােবিন্দ বসাক শশাঙ্ক বিরােধীদের সঙ্গে সহমত পােষণ করলেও উঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার ও ডঃ রমাপ্রসাদ চন্দ্র উপরােক্ত মতামতগুলি গ্রহণ করতে রাজি নন। তাদের মতে হর্ষের অনুগত হিউয়েন সাহু ও বাণভট্ট শশাঙ্ক বিদ্বেষী ছিলেন। হিউয়েন সাঙের রচনা থেকে জানা যায় যে, শশাঙ্কের রাজত্বকালে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল, রাজধানী কর্ণসুবর্ণে তাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল এবং তিনি নিজেই তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ প্রভৃতি স্থানে বহু বৌদ্ধ স্তুপ দেখেছিলেন।

কৃতিত্ব: বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলাকে এক বিশিষ্ট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাঙালি রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই প্রথম আর্যাবর্তে বাঙালির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন এবং তা আংশিকভাবে কার্যে পরিণত করেন। সুচতুর কূটকৌশলী শশাঙ্ক প্রবল শক্তিশালী হর্ষবর্ধনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় আধিপত্য বজায় রাখেন। তার রাজ্যজয় দ্বারা তিনি যে নীতির পত্তন করেন, তা অনুসরণ করে পরবর্তীকালে পালরাজারা এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, “বাণভট্টের মতাে চরিত-লেখক অথবা হিউয়েন সাঙ এর মতাে সুহৃদ থাকিলে হয়তাে হর্ষবর্ধনের মতােই তাহার খ্যাতিও চতুর্দিকে বিস্তৃত হইত। কিন্তু অদৃষ্টের নিদারুণ বিড়ম্বনায় তিনি স্বদেশে অখ্যাত ও অজ্ঞাত এবং শক্রর কলঙ্ক কালিমাই তাহাকে জগতে পরিচিত করিয়াছে।”

Q) শশাঙ্কের রাজধানী কোথায় ছিল?
Ans: শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ।

Q) শশাঙ্ক কোন দেবতার উপাসক ছিলেন?
Ans: শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন।