তাওবাদ কী?

প্রাচীন চৈনিক চিন্তার ইতিহাসে কনফুসীয় পন্থার পরেই তাওবাদের স্থান। তাওবাদ ছিল সবকিছু থেকে সরে থাকার ও প্রত্যাহার করে নেওয়ার দর্শন। নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ, সামাজিক স্থিতিশীলতার অভাব, ধ্বংস, মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় তাওবাদী চিন্তাবিদদের আশঙ্কিত করেছিল। তাই তারা ক্ষমতা, মর্যাদা ও সম্পদ অর্জনের জন্য সংঘাত এড়িয়ে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। তাওবাদে বিশ্বাসীরা মনে করতেন স্থান এবং কাল অনন্ত, আর সেখানে একজন ব্যক্তি এই মহাজাগতিক বিশ্বের এক একটি ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। তাওবাদ ছিল শাসকদের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের দর্শন। তাছাড়া যে সমস্ত চিন্তাবিদ কনফুসিয়াসের মতাদর্শ অনুসরণ করে অহেতুক নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব আরােপ করেছিলেন, তাদেরও বিরােধিতা করেছিল তাওবাদী দর্শন। তাওবাদী দর্শনের মূল কথা ছিল প্রকৃতির মধ্যে পথের অনুসন্ধান করা। ‘তাও’ শব্দের অর্থ পথ (way)। তাওপন্থীরা মনে করতেন জ্ঞানের প্রকৃত উৎস প্রকৃতি। সকলেরই উচিত প্রকৃতি সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান আহরণ করা এবং প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করা। নিডহ্যাম দেখিয়েছে প্রকৃতির মধ্যে পথের অন্বেষণ করতে গিয়ে তাওবাদীরা চীনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পশ্চিমী দেশগুলির তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তাওবাদী দর্শন সম্পর্কে জানার জন্য সামান্য কিছু ঐতিহাসিক উপাদান গবেষকদের হাতে এসেছে। গ্রন্থগুলির লেখকদের নাম অজানা এবং রচনাকাল সম্পর্কেও ঐতিহাসিকরা নিঃসংশয় নন। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও সম্মানিত গ্রন্থ ‘তাও তে চিং’ (The way and power classic)। খুব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল। রচনাকার হিসাবে কল্পকথার এক সন্ন্যাসী লাওৎ-সু -এর নাম করা হয়েছিল। চীনা কিংবদন্তী অনুসারে লাওৎ-সু কনফুসিয়াসেরও আগে জন্মেছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক গবেষণায় একথা স্পষ্ট যে, কনফুসীয়পন্থা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দর্শন। আর খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চু রাজত্বকালে তাওবাদের আবির্ভাব ঘটেছিল।

অন্যান্য রহস্যবাদীদের মতােই তাওপন্থীরাও তাদের মৌলিক ধারণাগুলি শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন না। তারা বলতেন— “যিনি জানেন তিনি কথা বলেন না, যিনি কথা বলেন তিনি জানেন না” (The one who knows does not speak, and the one who speaks does not know)। তাও হল নামহীন আকারহীন এমন এক পথ, যা সার্বিকভাবে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অবিরত পরিবর্তন সত্ত্বেও তাওবাদ এককমাত্রায় বিশ্বাসী। সেখানে বড়, ছােট, ভালােমন্দ, জীবন-মৃত্যু এসবের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারণ তাওবাদী ধারণায় সমস্ত কিছুই আপেক্ষিক। তাওবাদীরা কোন কিছু করার বিরােধী ছিলেন। তাদের মূল বক্তব্য ছিল Nothing doing । তার মানে এই নয় যে তারা নিষ্ক্রিয়তার দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা ছিলেন শান্তিবাদী। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে পরিপূর্ণ সমাজে তারা শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রাকৃতিক নিয়মেই জগৎসংসার এগিয়ে চলবে — ব্যক্তির উদ্যোগে কিছু না করলেও চলবে — একথাই তারা প্রচার করেছিলেন।

চীনা সংস্কৃতির প্রধান ধারণাগুলির মধ্যে তাওপন্থা এক চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করেছিল। ক্ষমতার অত্যধিক কেন্দ্রীকরণ মানব স্বাধীনতার ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা আরােপ করেছিল। কনফুসীয় নৈতিকতা ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি আনুগত্য স্বাধীন চিন্তার পথ আরও বেশি করে রুদ্ধ করেছিল। সেখানে তাওবাদ ব্যক্তির ইচ্ছা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল। স্বাধীন চিন্তার অপ্রতিহত প্রকাশ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটাবে — একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন তাওবাদের প্রবক্তারা।

একথা মনে রাখা দরকার, পাশ্চাত্য ধারণা অনুযায়ী যে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও পারস্পরিক সংঘাত সমাজে সক্রিয় ছিল, কনফুসীয়পন্থা ও তাওবাদ কিন্তু সেরকম পরস্পরবিরােধী স্বতন্ত্র কোন ধর্ম ছিল না। গােটা সমাজ একই সময়ে ও একই সঙ্গে কনফুসীয় দর্শনে এবং তাওবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী থাকতে পারত। যে মানুষ ক্ষমতার অলিন্দে ছিলেন তিনি ছিলেন কনফুসীয় দৃষ্টবাদে (positivism) বিশ্বাসী। তার একমাত্র উদ্দেশ্য সমাজকে রক্ষা করা। একই মানুষ যখন ক্ষমতার বাইরে, তখন তিনি তাওপন্থী শান্তিবাদী। তিনি তার নিজের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে ব্যস্ত। দিনের বেলার সক্রিয় আমলা সন্ধে বেলায় প্রকৃতি প্রেমিকে পরিণত হতেন। দর্শনের এবং ব্যক্তিত্বের এই সুষম দ্বৈধতা আধুনিক কালের চীনেও তার প্রভাব রেখেছে।