ক্যান্টন বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্য কি ছিল?

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার জন্য ইউরােপের অনেক জাতিই ক্যান্টনে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। চীন সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশীদের চীনাভাষা শেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার ফলে প্রত্যেক বাণিজ্য কুঠিতেই একজন বিশ্বস্ত চীনা কর্মচারী থাকত। তার সাহায্যে বিদেশীরা বাণিজ্য পরিচালনা করত এবং চীনের প্রয়ােজন অনুযায়ী পণ্যদ্রব্য আমদানি করার চেষ্টা করত।

তবে ইউরােপের অন্যান্য জাতির তুলনায় ইংরেজ বণিকগণই ক্যান্টনের বাণিজ্যে বিশেষ সাফল্য লাভ করে। কিন্তু ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের পর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ক্যান্টনের বাণিজ্য ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দেখা দেয়। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‘সম্রাটের অনুগৃহীত ব্যবসায়ী’ নামে পরিচিত এজেন্টদের মাধ্যমেই বিদেশীদের বাণিজ্য করার একমাত্র সুযােগ দেওয়া হত। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত এই পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই পদ্ধতির সাফল্য সন্তোষজনক না হওয়ায় কো-হং (Co-hong) নামে পরিচিত চীনের বিদেশী বাণিজ্যে নিযুক্ত বণিক সঙেঘর ওপর বৈদেশিক বাণিজ্যের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হলেও ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে কো-হং প্রথা পুনরায় চালু করা হয় এবং ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই প্রথার বিশেষ কোন পরিবর্তন করা হয়নি।

ক্যান্টনের বাণিজ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য একপাক্ষিকতা। চীনের লােকের ইউরােপের পণ্যদ্রব্যের প্রয়ােজন ছিল না, বিদেশী পণ্যদ্রব্যকে তারা বিশেষ কোন গুরুত্বও দিত না। কিন্তু চীনের পণ্যদ্রব্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই বিদেশী বণিকগণ দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে আসতে বাধ্য হত। চীন সম্রাট চি-এন-লুঙ ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জকে পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ” As your ambassador see for himself we possess all things; I set no value on objects strange or ingenious, and I have no use for your country’s manufactures.”। চীনের সাধারণ লােকের ধারণা হয় যে, বিদেশী বণিকগণ নিজেদের দেশের মঙ্গলের জন্যই চীনের পণ্যদ্রব্য ক্রয় করতে আসে। এমনকি ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ক্যান্টনের বাণিজ্য কমিশনার লিন সে-সু-ও মন্তব্য করেন যে চীনের চা ও চিনির জন্য বিদেশীরা চীনে আসতে বাধ্য। সেজন্য চীনের অধিবাসীরা বাণিজ্যক্ষেত্রে নিজেদের বিশেষ শক্তিশালী বলে বিবেচনা করত। প্রকৃতপক্ষে বিদেশী বাণিজ্য বন্ধ হলে চীনের রাজকর্মচারীদের কিছু ক্ষতি হলেও সাধারণ লােকের বা রাজকোষের কোনই ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। সুতরাং বিদেশী বণিকদের বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়ে তাদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করার সুযােগ পেত। তাছাড়া বিদেশীদের এই বাণিজ্যকে তারা একটি সুযােগ বলে মনে করত, অধিকাররূপে তার কোন স্বীকৃতি ছিল না এবং তাদের ধারণা ছিল, যে কোন সময়েই এই সুযােগ বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাইরের দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ছিল একমাত্র বাণিজ্যিক এবং ক্যান্টন বন্দরের বাণিজ্যপথ উন্মুক্ত রাখার জন্য বিদেশী বণিকগণ চীন সরকারের সকল শর্তই মেনে নিতে বাধ্য ছিল।