সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা?

প্রাচীন বিশ্বে হরপ্পা সভ্যতার মতাে এমন একটি উন্নত সভ্যতার স্রষ্টা কারা — এ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্যের অন্ত নেই। অনেকের মতে, সুমেরীয়রা হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা। অনেকে এ সম্পর্কে দ্রাবিড়দের কথা বলেন। অনেকের মতে আর্যরা হরপ্পা সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। অনেকে আবার এ সম্পর্কে ব্রাহুই, অসুর, নাগ, পণি, ব্রাত্য, দাস প্রভৃতি জাতির কথা বলেন। আসলে এ ব্যাপারে তথ্যাদি অতি কম। এছাড়া হরপ্পা লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে যত মতামতই প্রকাশিত হােক না কেন, তাদের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়।

সুমেরীয় জাতি: এক সময় মনে করা হত যে মেসােপটেমিয়া বা সুমেরের লােকেরাই হরপ্পা সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। স্যার মর্টিমার হুইলার এবং গর্ডন চাইল্ড এই মতের সমর্থক। এ সময় দুই সভ্যতার নগর জীবন, কৃষিকার্য, পশুপালন, ধাতুবিদ্যা, বস্ত্রবয়ন, ইট ও পাথরের কাজ প্রভৃতি নানা বিষয়ের সাদৃশ্য তুলে ধরা হত। হুইলার বলেন যে, হরপ্পা সংস্কৃতি সুমেরীয় সভ্যতার কাছে ঋণী এবং সুমেরীয় সভ্যতাই সিন্ধু অববাহিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল মাত্র। তার মতে, এই সভ্যতা বিদেশাগত বলেই এটি কেবলমাত্র ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল — ভারতের অভ্যন্তরে বিস্তৃত হয় নি।

অধ্যাপক গর্ডন চাইল্ড এর মতে, উভয় সভ্যতার শিকড় এক। বলা বাহুল্য, উভয় সভ্যতার মধ্যে বৈসাদৃশ্যও নেহাত কম নয়। মৃতদেহ সৎকার, পােষাক পরিচ্ছদ, খাদ্যরীতি, মৃৎপাত্র, সিলমােহর, লিপি, নারীদের কেশবিন্যাস প্রভৃতি দিক থেকে উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। উভয় সভ্যতাই স্থানীয় ও স্বীয় বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ। সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে হরপ্পা সভ্যতার গঠন ও বিকাশে বিদেশি প্রভাবের মতবাদ পরিত্যক্ত হয়েছে। মার্শাল, ব্যাসাম প্রমুখ মনে করেন যে, বিদেশি কোনও প্রভাব নয়— স্থানীয় সংস্কৃতিই হরপ্পা সভ্যতার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

ডঃ ব্যাসাম বলেন যে, হরপ্পার নগরগুলি যারা নির্মাণ করেছিল তারা ছিল সম্ভবত বহু শতাব্দী ধরে সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসী। হরপ্পা সভ্যতার মানুষগুলি যখন তাদের এইসব শহরের পরিকল্পনা হাতে নেয়, তখন তারা সম্পূর্ণত ভারতীয়। অলচিন-দম্পতি (ব্রিজে অলচিনও রেমণ্ড অলচিন) মনে করেন যে, বৈদেশিক প্রভাব অপেক্ষা স্থানীয় সংস্কৃতিই ছিল হরপ্পার নগরগুলির উদ্ভবের স্তম্ভ। যদি সেখানে কোনও বৈদেশিক প্রভাব থাকে তবে তা উদ্ভবের সময় পড়ে নি — পড়েছিল বিকাশের কালে।

দ্রাবিড় জাতি: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রেভারেণ্ড হেরাস, ডঃ সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায়, ডঃ ব্যাসাম প্রমুখ দেশি-বিদেশি পণ্ডিতদের মতে দ্রাবিড় জাতিই হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা। আর্য আগমনের পূর্বে দ্রাবিড়রা উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিম ভারতে বাস করত। আজও বেলুচিস্তানে ব্রাহুই বলে একটি উপজাতি আছে, যারা দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে। সম্ভবত এরা দ্রাবিড়দেরই একটি গােষ্ঠী। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে যে, আর্যরা একটি অনার্য গােষ্ঠীকে পরাজিত করেছিল। সম্ভবত এই অনার্য গােষ্ঠী হল দ্রাবিড়রা। সিন্ধুলিপির সঙ্গে প্রাচীন তামিল লিপির যথেষ্ট মিল আছে। ধর্মের দিক থেকে দুই সভ্যতার মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে। হরপ্পা সভ্যতার মতােই শিব, শক্তি, লিঙ্গ ও যােনি পূজা দ্রাবিড়দের মধ্যে প্রচলিত। দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় ও প্রােটো অস্ট্রালয়েড মানুষের মিশ্রণ দেখা যায়। সিন্ধু উপত্যকায় এই দুই জনগােষ্ঠীরই সংখ্যাধিক্য ছিল।

জাঁ ফিলিওজা বলেন যে, হরপ্পা সভ্যতা ছিল উন্নত বাণিজ্য-নির্ভর। প্রাক্-আর্য যুগে মুন্ডা ও দ্রাবিড়রাই ছিল ভারতের প্রধান জনগােষ্ঠী। মুন্ডাদের উন্নত সভ্যতা ছিল না। সুতরাং দ্রাবিড়রাই হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা। বলা বাহুল্য, হরপ্পা সভ্যতার দ্রাবিড়ীয় উৎপত্তি মতবাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ উঠেছে। বলা হয় যে, (ক) হরপ্পাবাসী ও দ্রাবিড়দের শব সৎকারের পদ্ধতি পৃথক। (খ) দ্রাবিড়রাই যদি হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা হয়, তাহলে দ্রাবিড় সভ্যতার পীঠভূমি দাক্ষিণাত্যে হরপ্পা সভ্যতার অনুরূপ কোনও নাগরিক সভ্যতার বিকাশ ঘটল না কেন? (গ) ব্রাহুইরা তুর্কো-ইরানীয় জাতিগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জাতিগত দিক থেকে তারা দ্রাবিড়দের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সুতরাং এই মতটিও গ্রহণযােগ্য নয়।

আর্য জাতি: A. D. Pusalkar, S. R. Rao, অলচিন দম্পতি প্রমুখ দেশি বিদেশি ঐতিহাসিক মনে করেন যে, আর্যরাই হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা। গর্ডন চাইল্ড, জন মার্শাল, ব্যাসাম প্রমুখ ঐতিহাসিকরা অতি দৃঢ়তার সঙ্গে এই মতবাদ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে এই দুই সভ্যতার মধ্যে মৌলিক ও গুণগত পার্থক্য যথেষ্ট। জন মার্শাল বলেন যে, সিন্ধু সভ্যতা আর্য সভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীন ও ভিন্ন প্রকৃতির।
(ক) আর্য সভ্যতা গ্রামীণ, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক।
(খ) আর্যরা সােনা, তামা, ব্রোঞ্জ ও সম্ভবত লােহার ব্যবহার জানত, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতার মানুষ লােহার ব্যবহার জানত না।
(গ) আর্যরা বর্ম, শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহার করত, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতায় এগুলি ছিল না।
(ঘ) হরপ্পার নগরগুলিতে বাণিজ্য ও শিল্পই ছিল মানুষের প্রধান জীবিকা। আর্যদের প্রধান জীবিকা ছিল পশুপালন ও কৃষি।
(ঙ) ঘােড়া আর্যদের কাছে গৃহপালিত ছিল, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতায় ঘােড়া ছিল প্রায় অজানা।
(চ) সিন্ধুবাসী শিব ও মাতৃপূজা করত। আর্যদের কাছে এগুলি ছিল গৌণ। সিন্ধুবাসী লিঙ্গ, যােনি ও মূর্তিপূজা করত। আর্যদের কাছে এগুলি নিন্দনীয় ছিল। এইসব কারণে জন মার্শাল সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা হিসেবে আর্য দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।

অন্যান্য মতবাদ: এই ব্যাপারে অনেকে পণি, অসুর, ব্রাত্য, দাস, নাগ প্রভৃতি জাতিগােষ্ঠীর কথা বলে থাকেন। এ ব্যাপারে পণ্ডিতদের হাতে তথ্যাদি এত কম যে, এ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব নয়।

মিশ্র সভ্যতা: সিন্ধু উপত্যকায় প্রাপ্ত নরকঙ্কালগুলির নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষা করে পণ্ডিতরা এখানে চারটি জনগােষ্ঠীর মানুষের সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলি হল প্রােটো অস্ট্রালয়েড, ভূমধ্যসাগরীয়, আলপাইন ও মােঙ্গলীয়। কঙ্কালগুলির মিশ্র সভ্যতা সংখ্যা এত কম যে, সেগুলি থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব নয়। সুতরাং বলা হয় যে, হরপ্পা সভ্যতা বিশেষ কোনও জাতিগােষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট হয় নি বিভিন্ন জাতির মানুষের প্রচেষ্টায় এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি নৃতাত্ত্বিক ডঃ ডি. কে. সেন এই অঞ্চলের কঙ্কালগুলি নতুন করে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, এখানে একটি জাতিগােষ্ঠীর মানুষই বাস করত। তারা হল এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের বংশধর এবং তারাই এই সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। আবার এও বলা হয় যে, হরপ্পা সভ্যতার আদি বিকাশ কেন্দ্র এখনও অনাবিষ্কৃত রয়েছে। মহেঞ্জোদারাের নীচের দিকে কয়েকটি স্তর এখনও জলমগ্ন থাকায় সেখানে কোনও পরীক্ষা চালানাে সম্ভব হয় নি। এছাড়া হরপ্পা লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এখনও সঠিক কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে সম্ভব নয়। তাই বলা যায় যে, বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর মানুষের সাহায্যে হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।